বাবা-মায়ের আমলের ফ্রিজ অনায়াসে ২০–২৫ বছর চলত। অথচ এখনকার ফ্রিজ, টিভি বা ওয়াশিং মেশিন পাঁচ–ছয় বছরেই ভোগাতে শুরু করে। হাতের ফোনটার কথাই ধরুন। হার্ডওয়্যার ঠিক থাকলেও নতুন অ্যাপ চলছে না, সফটওয়্যার আপডেট বন্ধ—বাধ্য হয়ে নতুন ফোন কেনার কথা ভাবতে হচ্ছে।
এটা কি শুধুই প্রযুক্তির স্বাভাবিক অগ্রগতি, নাকি পণ্যগুলো এমনভাবেই বানানো হচ্ছে, যেন আপনি নতুনটি কিনতে বাধ্য হন?
এর একটি নাম আছে—প্ল্যানড অবসোলেসেন্স (Planned Obsolescence)। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট সময় পর পণ্যটি যেন অচল বা পুরোনো মনে হয়, সেভাবেই এর নকশা ও জীবনচক্র নির্ধারণ করা হয়। ফলে ভোক্তার সামনে নতুন পণ্য কেনা ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না।
তবে দ্রুত নষ্ট হওয়া মানেই যে তা ইচ্ছাকৃত—এমন নয়। প্রযুক্তির অগ্রগতি, উৎপাদন খরচ কমানো কিংবা নতুন নিরাপত্তা ও কর্মক্ষমতার চাহিদার কারণেও পণ্যের আয়ু কমতে পারে। তাহলে কোথায় এটি ব্যবসায়িক কৌশল, আর কোথায় প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা?
উত্তর খুঁজতে আমাদের প্রায় ১০০ বছর পেছনে ফিরতে হবে।
১৯২৪ সালে বৈদ্যুতিক বাল্বের বাজার ছিল রমরমা। তখন জেনারেল ইলেকট্রিক, ফিলিপসসহ কয়েকটি বড় নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মিলে তৈরি করে ফিবাস কার্টেল (Phoebus Cartel)। সে সময়ের অনেক বাল্ব আড়াই হাজার ঘণ্টা পর্যন্ত চলত। সমস্যা হলো, বাল্ব এত দিন টিকলে গ্রাহক ঘন ঘন নতুন বাল্ব কিনবেন না।
বিক্রি বাড়াতে কার্টেলটি বাল্বের আয়ু ১,০০০ ঘণ্টায় নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করে। এমনকি বেশি টেকসই বাল্ব তৈরি করলে নির্মাতাদের জরিমানার মুখেও পড়তে হতো। যেসব প্রকৌশলী একসময় টেকসই বাল্ব তৈরির কাজ করতেন, তাদেরই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বাল্বের আয়ু কমানোর কাজে।
প্ল্যানড অবসোলেসেন্সের আলোচনায় এই ঘটনাটি বারবার আসে। কারণ, এখানে পণ্যের আয়ু কমিয়ে ব্যবসায়িক লাভ বাড়ানোর একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ দেখা যায়।
অবশ্য আজকের দিনে পণ্য অচল হওয়ার পেছনে শুধু ইচ্ছাকৃত নকশাই দায়ী নয়। মেরামতের জটিলতাও বড় একটি সমস্যা।
ছোটবেলার সেই ভারী ফ্রিজ বা টিভিতে যান্ত্রিক অংশ বেশি থাকায় সহজেই বিভিন্ন পার্টস বদলে মেরামত করা যেত। এখনকার যন্ত্রে থাকে সেন্সর, সফটওয়্যার এবং জটিল সার্কিট। এগুলো বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ও কার্যকর হলেও ছোট একটি অংশ নষ্ট হলে অনেক সময় পুরো বোর্ডই বদলাতে হয়। খুচরা যন্ত্রাংশও সহজে পাওয়া যায় না। আবার মেরামতের খরচ নতুন পণ্য কেনার কাছাকাছি চলে যায়।
তাই পণ্য কতদিন টিকল, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—নষ্ট হওয়ার পর সেটি যুক্তিসংগত খরচে মেরামত করা যাচ্ছে কি না।
অনেক সময় যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়ারও দরকার পড়ে না। হার্ডওয়্যার ঠিক থাকলেও সফটওয়্যার সেটিকে অচল করে দিতে পারে।
২০১৭ সালের একটি ঘটনা এর বড় উদাহরণ। সফটওয়্যার আপডেটের পর পুরোনো আইফোন ধীর হয়ে যাওয়ার অভিযোগ তোলেন অনেক ব্যবহারকারী। তাদের মনে হয়েছিল, ফোনটি বুঝি পুরোনো হয়ে গেছে এবং নতুন ফোন কেনা ছাড়া উপায় নেই।
পরে অ্যাপল স্বীকার করে যে, সফটওয়্যার আপডেটের মাধ্যমে তারা পুরোনো আইফোনের প্রসেসরের গতি কমিয়ে দিয়েছিল। অ্যাপলের ব্যাখ্যা ছিল—পুরোনো ব্যাটারি পর্যাপ্ত শক্তি সরবরাহ করতে না পারলে ফোন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সেই ঝুঁকি কমাতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
প্রযুক্তিগতভাবে এর পেছনে যুক্তি থাকলেও ব্যবহারকারীরা বিষয়টি জানতেন না। ফলে অনেকেই মনে করেছিলেন, তাদের ফোনটি আর কার্যকর নেই। পরে বিভিন্ন দেশের তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপের মুখে অ্যাপলকে জরিমানার মুখে পড়তে হয়। তারা ব্যাটারি বদলের খরচ কমায় এবং আইফোনে Battery Health ফিচার যুক্ত করে।
গল্পটা শুধু স্মার্টফোনের নয়।
প্রিন্টারের কার্ট্রিজে কালি আছে, অথচ স্ক্রিনে দেখাচ্ছে—“Replace Cartridge”। কালি শেষ না হলেও প্রিন্টার কাজ করছে না। বছরের পর বছর প্রিন্টার নির্মাতাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে। ফার্মওয়্যারের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষের তৈরি কার্ট্রিজ ব্যবহারও সীমিত বা বন্ধ করা হয়।
নির্মাতাদের দাবি, এতে প্রিন্টের মান বজায় থাকে এবং যন্ত্রের সুরক্ষা নিশ্চিত হয়। কিন্তু ভোক্তার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন থেকেই যায়—একটি সচল যন্ত্র কেন নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের একটি নির্দিষ্ট উপাদান ছাড়া কাজ করবে না?
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে অন্যান্য ডিভাইসেও।
স্মার্ট টিভি সচল, কিন্তু স্ট্রিমিং অ্যাপ আর চলছে না। ল্যাপটপ ঠিক আছে, কিন্তু নতুন অপারেটিং সিস্টেম ইনস্টল করা যাচ্ছে না। ফোন চালু আছে, অথচ নিরাপত্তা আপডেট বন্ধ।
অর্থাৎ, যন্ত্রটি নষ্ট না হলেও সফটওয়্যারই সেটিকে কার্যত অচল করে দিতে পারে।
তবে অনন্তকাল সফটওয়্যার আপডেট দেওয়া সম্ভব নয়। পুরোনো হার্ডওয়্যারে নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা আধুনিক সফটওয়্যার সবসময় কার্যকরভাবে চালানো যায় না। তাই সব ক্ষেত্রকেই ইচ্ছাকৃত ব্যবসায়িক কৌশল বলা যাবে না।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—এখন কোনো পণ্যের আয়ু শুধু তার হার্ডওয়্যার নির্ধারণ করে না; সফটওয়্যারও তার জীবনচক্র ঠিক করে দেয়।
আবার অনেক ক্ষেত্রে পণ্য নষ্ট হওয়ারও প্রয়োজন হয় না। বদলে যায় আমাদের ধারণা।
আপনার পোশাকটি হয়তো রং হারায়নি, ছিঁড়েও যায়নি। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে নতুন ট্রেন্ড আসায় আগের পোশাকটি আর ভালো লাগছে না। ফাস্ট ফ্যাশন শিল্প অনেকটাই এই মনস্তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
আগে বছরে কয়েকটি নতুন কালেকশন আসত। এখন প্রায় প্রতি সপ্তাহেই নতুন ডিজাইন বাজারে আসে। ফলে পোশাকটি নষ্ট হওয়ার আগেই আমাদের চোখে পুরোনো হয়ে যায়।
পাশাপাশি কম দামের অনেক পোশাক দ্রুত উজ্জ্বলতা হারায় বা ক্ষয়ে যায়। একে বলা হয় সাইকোলজিক্যাল অবসোলেসেন্স (Psychological Obsolescence)। পণ্যটি অচল হয় না, কিন্তু আমাদের চোখে তার মূল্য কমে যায়।
অবশ্য বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি ভোক্তার নিজস্ব পছন্দ ও আচরণও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ, প্রতিটি কেনাকাটাই যে কোম্পানির পরিকল্পিত কৌশলের ফল—তা নয়।
তাহলে কোম্পানিগুলো লাভবান হয় কীভাবে?
অর্থনীতির হিসাবটা সহজ। একটি পণ্য ২০ বছর টিকলে একজন গ্রাহকের কাছ থেকে কোম্পানি হয়তো একবারই আয় করবে। কিন্তু সেই গ্রাহক যদি কয়েক বছর পরপর নতুন পণ্য কেনেন, তাহলে একই গ্রাহকের কাছ থেকেই বারবার বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়।
অবশ্য নতুন প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, নিরাপত্তা এবং গবেষণায় কোম্পানিগুলোকেও বিপুল বিনিয়োগ করতে হয়। তাই নতুন পণ্য বাজারে আনা মানেই পুরোনো পণ্যকে ইচ্ছাকৃতভাবে অচল করে দেওয়া নয়।
কিন্তু যখন একটি পণ্য মেরামত করার চেয়ে নতুন পণ্য কেনা সস্তা হয়ে যায়, তখন ভোক্তার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই বদলে যায়।
এর প্রভাব শুধু আমাদের পকেটে পড়ে না, পরিবেশের ওপরও পড়ে।
প্রতিবছর বিশ্বে বিপুল পরিমাণ ইলেকট্রনিক বর্জ্য তৈরি হয়। এর একটি অংশ পুনর্ব্যবহার করা কঠিন এবং এতে সিসা, পারদসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান থাকতে পারে। নতুন স্মার্টফোন তৈরিতে প্রয়োজন হয় লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল ও তামার মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ।
সময়ের আগেই ডিভাইস বদলে ফেললে এসব প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপও বাড়ে।
এই কারণেই বিশ্বজুড়ে রাইট টু রিপেয়ার (Right to Repair) আন্দোলন জোরালো হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এমন নীতি নেওয়া হচ্ছে, যাতে খুচরা যন্ত্রাংশ সহজে পাওয়া যায় এবং পণ্য মেরামত করা যায়।
তবে আইনের পাশাপাশি ভোক্তা হিসেবে আমাদের নিজেদেরও সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
নতুন কিছু কেনার আগে কয়েকটি প্রশ্ন করা জরুরি—
পণ্যটি কত বছর সফটওয়্যার ও নিরাপত্তা আপডেট পাবে?
নষ্ট হলে খুচরা যন্ত্রাংশ পাওয়া যাবে কি?
মেরামতের খরচ কত?
আর সবচেয়ে বড় কথা—নতুন পণ্যটি কি সত্যিই প্রয়োজন, নাকি শুধু নতুন বলেই আমরা সেটি কিনতে চাইছি?
কারণ পণ্য কতদিন টিকবে, সেই সিদ্ধান্তে শুধু নির্মাতাই নয়—ভোক্তার সচেতন সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ।
Weebizz — উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ ও ব্যবসায়ীদের জন্য একটি তথ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম। এখানে ব্যবসা, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তার সাফল্যের গল্প, বাজার বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক তথ্য সহজ ও নির্ভরযোগ্যভাবে তুলে ধরা হয়।
No comments
Post a Comment